ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানীতে প্রধান শিক্ষিকাকে পদত্যাগ বাধ্য করলো বহিরাগতরা, হেনস্তার অভিযোগ

রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার হযরত শাহ আলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নার্গিস আক্তারকে অবরুদ্ধ করে এক মাসের সাময়িক পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী প্রধান শিক্ষক খলিফা উজির আহমেদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বহিরাগতরা হেনস্তা করেছেন বলে অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের।

যদিও খলিফা উজির আহমেদ এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ছাত্ররা এসে প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম পেয়েছে। রাজধানীর এই প্রতিষ্ঠানটিতে ২৩ বছর ধরে প্রধান শিক্ষিকা পদে শিক্ষকতা করে আসছেন নার্গিস আক্তার। বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। বহিরাগতদের দিয়ে তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানিয়েছেন।

নার্গিস আক্তারকে হেনস্তার ঘটনা বৃহস্পতিবার ঘটলেও শুক্রবার বিষয়টি জানাজানি হয়েছে। এ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রধান শিক্ষিকা অভিযোগ করে বলেন, স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক খলিফা উজির আহমেদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বহিরাগতদের নিয়ে বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটির পর তাকে পদত্যাগের জন্য অবরুদ্ধ করেন। বহিরাগতরা দুপুর থেকেই স্কুলের গেটে তালা লাগিয়ে নানাভাবে হেনস্তা করতে থাকেন বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে পদত্যাগের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। সে সময় স্কুলের কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না।

তিনি আরও বলেন, আমি বাধ্য হয়ে বলি, আমার এখানে প্রায় সাত'শ ছাত্রী পড়াশোনা করে। তারা এবং তাদের অভিভাবকরা কেউ আমার পদত্যাগের দাবি তোলেনি। তাহলে কার স্বার্থে আমি পদত্যাগ করব? এমন প্রশ্ন করলে তারা আমার ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে মিরপুরের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়ক আশিকুর রহমানকে ফোন করে আমি স্কুলে আসতে বলি। আশিকুর রহমান তার সহযোগীদের নিয়ে স্কুলে এলে দেখতে পান, স্কুলের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে যারা আমাকে পদত্যাগের জন্য হুমকি দিচ্ছেন, তারা কেউ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জড়িত নন। কয়েক ঘণ্টা বহিরাগত উচ্ছৃঙ্খল এসব সন্ত্রাসীকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন তারা। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আশিকুর রহমানের নেতৃত্বে আসা বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা বিকেল ৫টার দিকে স্কুল ত্যাগ করে।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আশিকুর রহমান চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই আবার সেই বহিরাগত সন্ত্রাসীরা স্কুলে প্রবেশ করে নার্গিস আক্তারকে অবরুদ্ধ করে এবং তাদের হাতে লেখা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। অন্যথায় জানে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। যেখানে লেখা ছিল, এক মাসের জন্য সাময়িক পদত্যাগ করছি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মিরপুর এলাকার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের টিম লিডার আশিকুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, শাহ আলী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন স্থানীয় কিছু যুবক। তাদের সাথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রধান শিক্ষককে নাজেহাল করা থেকে বিরত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওদের তুলনায় আমরা ছিলাম সংখ্যায় কম। যেসব দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা বলে প্রধান শিক্ষককে হেনস্তা করা হয়েছে, সেটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না বলেও জানান তিনি।

যে স্কুলে সাত শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, সেখানে ঘটনার সময় ৫০ জন শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিল না বলেও যোগ করেন আশিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় এক নেতা বলেন, প্রধান শিক্ষিকা এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নিতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের কারণে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠান অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সহকারী প্রধান শিক্ষক খলিফা উজির আহমেদ এর সাথে। তিনি বলেন, তার রুমে গত তিন মাস ধরে পত্রিকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক নার্গিস আক্তার। এছাড়া সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে হেড মাস্টারের কাছে একটি স্মার্ট ফোন চেয়ে এলেও তিনি সেটি কিনে দিচ্ছেন না।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্কুলের মার্কেটের টাকা, দোকান ভাড়া এসব প্রধান শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে জমা রাখেন না। এসব বিষয়ে অভিযোগ দিলেও মাউশি, মন্ত্রণালয়ে টাকা দিয়ে ফাইল চাপিয়ে রাখা হয়। এজন্য কোনো তদন্তও হয়নি। অন্য কোনো শিক্ষক বা অভিভাবক নার্গিস আক্তারের পদত্যাগ না চাইলেও তিনি কেন বহিরাগতদের নিয়ে হেনস্তা করছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে খলিফা উজির আহমেদ জানান, স্কুলের সব শিক্ষক আর অভিভাবক হেড টিচার নার্গিসের চামচা। যারা স্কুলে এসেছিলেন তারা সমন্বয়ক কি না জানি না। এরা তো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র এটা জানি।

ads
ads
ads

Our Facebook Page